
মোঃ আমিনুল ইসলামঃ
সরকারি দপ্তরে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিনের তদবির ও কথিত ‘বদলি-বাণিজ্য’ রোধে লটারিভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করে প্রশংসার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলীদের বদলিতে এ পদ্ধতির সফল প্রয়োগের পর অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও দপ্তরেও এ মডেল অনুসরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বদলি-পদায়নে ব্যক্তিগত প্রভাব ও তদবিরের সুযোগ কমাতে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ইতোমধ্যে আইন মন্ত্রণালয়ও সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি প্রয়োগ শুরু করেছে।
বদলি-পদায়ন সরকারি প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রম হলেও কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে তদবির, প্রভাব খাটানো ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও আকর্ষণীয় কর্মস্থলে পদায়নকে ঘিরে প্রতিযোগিতা ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
এই বাস্তবতায় নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতিমালার আওতায় উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমে কর্মস্থল নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে ব্যক্তিগত যোগাযোগ, তদবির কিংবা বিশেষ সুবিধা পাওয়ার সুযোগ কমবে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
তিন দফায় বদলি ১ হাজার ৪৩০ প্রকৌশলী:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে তিন দফায় মোট ১ হাজার ৪৩০ জনকে লটারি পদ্ধতিতে বদলি করা হয়েছে।
গত ৩০ জুলাই প্রথম দফায় ৭৬৭ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে বদলি করা হয়। এরপর ৩ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় আরও ২৫৪ জন উপসহকারী প্রকৌশলীকে একই পদ্ধতিতে বদলি করা হয়।
সর্বশেষ ১৬ আগস্ট তৃতীয় দফায় বদলি করা হয় ৪০৯ জন সহকারী ও উপবিভাগীয় প্রকৌশলীকে। এদের মধ্যে ১৫২ জন সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল), ৬৭ জন সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম), ১৩৫ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (সিভিল) এবং ৫৫ জন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (ই/এম) রয়েছেন।
বদলি-পদায়নে লটারি পদ্ধতির উদ্যোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতেই তিনি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে বদলি-পদায়নকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও তদবিরের একটি দুষ্টচক্রের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পেতে কেউ কেউ প্রভাবশালী মহলের সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করেন, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন করে তোলে। মন্ত্রী স্পষ্ট করেন, তাঁর দায়িত্ব পালনকালে এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিটি দপ্তরে এ কার্যক্রম কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও জোরদার হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও লটারি পদ্ধতি অনুসরণ করছে জেনে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
নির্বাহী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদের বদলিতেও লটারি
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নেও লটারি পদ্ধতি প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষ করে যেসব পদে কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থল নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে বেশি আগ্রহ ও প্রতিযোগিতা দেখা যায়, সেসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে প্রশাসনিক প্রয়োজন, পদের দায়িত্ব, কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও প্রচলিত বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করাই হবে এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করার অন্যতম শর্ত।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, লটারি পদ্ধতির সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো বদলি-পদায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে দৃশ্যমান ও যাচাইযোগ্য করা। কোনো কর্মকর্তা কোথায় পদায়িত হবেন, তা যদি পূর্বনির্ধারিত নিয়ম ও উন্মুক্ত প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয়, তাহলে তদবিরের অভিযোগ ওঠার আশঙ্কা কমবে।
তবে সব ধরনের বদলি ও পদায়নে একই পদ্ধতি প্রয়োগ করা বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে। কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, প্রশাসনিক প্রয়োজন, কর্মস্থলের ধরন, পারিবারিক ও বিশেষ পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।
কারণ শুধু লটারি আয়োজন করলেই সুশাসন নিশ্চিত হয় না; বরং লটারির আগে ও পরে প্রতিটি ধাপে নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ, সিদ্ধান্তের জবাবদিহি এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হয়। এসব বিষয় নিশ্চিত হলে লটারিভিত্তিক পদায়ন একটি কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে পারে।
সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা সুশাসনের অন্যতম প্রধান শর্ত। বদলি-পদায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত প্রভাবের পরিবর্তে নিয়মতান্ত্রিক ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আস্থা বাড়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের লটারিভিত্তিক বদলি উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই একটি দৃষ্টান্ত। এখন এ উদ্যোগের স্থায়িত্ব, কার্যকারিতা এবং অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে তদবিরের পরিবর্তে স্বচ্ছ প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়ার এই উদ্যোগ প্রশাসনিক সংস্কারের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে নিয়মের ধারাবাহিক প্রয়োগ, নিরপেক্ষতা এবং সব পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।