
স্টাফ রিপোর্টার:– যাত্রী সংকট ও ক্রমাগত লোকসানের কারণ দেখিয়ে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী হাতিয়া-চট্টগ্রাম নৌরুটে সব ধরনের স্টিমার চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) যৌথভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
হঠাৎ করে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌরুটে স্টিমার চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তি ও উদ্বেগে পড়েছেন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার প্রায় সাত লাখ বাসিন্দা। মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম প্রধান ও নিরাপদ মাধ্যম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় জনজীবন, চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাতিয়ার অর্থনীতি, শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে এই নৌরুটের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। স্টিমার চলাচল বন্ধ থাকায় জরুরি রোগীদের চট্টগ্রাম কিংবা মূল ভূখণ্ডে নেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষার জন্য যাতায়াতকারী শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষও পড়েছেন দুর্ভোগে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আনা-নেওয়া ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় দ্বীপটির সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
যোগাযোগের পর্যাপ্ত বিকল্প ও নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাতিয়াবাসী। দ্রুত এই ঐতিহ্যবাহী নৌরুটে স্টিমার সার্ভিস পুনরায় চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
হাতিয়ার সুশীল সমাজের প্রতিনিধি মো. নূরুল আলম জসীম বলেন, “এই রুটের স্টিমার সার্ভিসের সঙ্গে দ্বীপবাসীর স্মৃতি বিজড়িত আত্মার সম্পর্ক রয়েছে। এ সার্ভিসের মাধ্যমে দেশবাসী দ্বীপ উপজেলা হাতিয়াকে জানতে ও চিনতে পেরেছে। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়া হাতিয়াবাসীর স্মৃতিচিহ্ন মুছে যাওয়ার মতো।”
বিআইডব্লিউটিসি ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ১৯০৬ সালে ব্রিটিশ সরকার এ অঞ্চলে স্টিমার সার্ভিস চালু করে। সে সময় চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ-হাতিয়া রুটে স্টিমার চলাচল করত।
এই নৌরুটের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনাও। ১৯৫৬ সালের ২ জুন চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ-হাতিয়া রুটে চলাচলকারী কয়লাচালিত ‘বাদুরা’ জাহাজ সন্দ্বীপ চ্যানেল অতিক্রমের সময় প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে ডুবে যায়। এতে পাঁচ শতাধিক যাত্রী নিহত হন বলে জানা যায়।
পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন সরকার চট্টগ্রাম-হাতিয়া নৌরুটে এমভি তাজুল ইসলাম, এমভি আলাউদ্দিন, এমভি মনিরুল হক ও এমভি আব্দুল মতিন নামের চারটি জাহাজ চালু করে। তবে প্রায় এক দশকের মধ্যেই ১৯৭৪ সালের দিকে এমভি তাজুল ইসলাম এবং পরবর্তী সময়ে এমভি আলাউদ্দিনকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে বিক্রি করে দেয় নৌপরিবহন করপোরেশন।
২০০৯ সালে মেরামতের জন্য এমভি আব্দুল মতিন ও এমভি মনিরুল হককে ডকইয়ার্ডে নেওয়া হলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
পরে আবার আধুনিক ও দ্রুতগামী এমভি বার আউলিয়া, এমভি তাজউদ্দীন ও এমভি টেকনাফ চালুর সিদ্ধান্ত নেয় বিআইডব্লিউটিসি। দীর্ঘ সময় এসব জাহাজ চলাচল করলেও গত ৬ জুলাই থেকে রুটটিতে সব ধরনের যাত্রীবাহী জাহাজ বা স্টিমার চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিসির যাত্রী সার্ভিস ইউনিটের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) খন্দকার মুহাম্মদ তানভীর হোসেন বলেন, হাতিয়া থেকে জেলা সদরে যাতায়াতের জন্য অন্য রুটে সি-ট্রাক ও ফেরি চলাচল করায় এ রুটের সার্ভিসটি ক্রমাগত লোকসানে পড়ছিল। এ কারণেই আপাতত স্টিমার চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে দ্বীপবাসীর দাবি, লোকসানের অজুহাতে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ এই নৌযোগাযোগ বন্ধ না করে যাত্রীসেবা টিকিয়ে রাখতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। দ্রুত স্টিমার চলাচল পুনরায় চালু করা না হলে হাতিয়ার লাখো মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।