
কোরবানির ঈদের দুপুর। চারদিকে উৎসবের আমেজ। ঘরে ঘরে পোলাও, মাংসসহ বাহারি রান্নার আয়োজন। বাতাসে ভাসছে সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ। শিশুরা নতুন পোশাক পরে আনন্দে মেতে উঠেছে। ঠিক তখনই পটুয়াখালীর বাউফলের এক কোণে নদীতে ভাসমান মান্তা পল্লীর নৌকাগুলোতে রান্না হচ্ছে নদী থেকে ধরা ছোট মাছ আর ডাল-ভাত।
অন্যসব পরিবারের শিশুরা যখন পোলাও-মাংস খাচ্ছে, তখন মান্তা সম্প্রদায়ের শিশুরা বসে আছে এক থালা ডাল-ভাত কিংবা মাছের তরকারির অপেক্ষায়। ঈদের আনন্দ যেন তাদের জীবনে পৌঁছায় না। প্রতিদিনের মতোই নদী আর নৌকার সঙ্গে যুদ্ধ করেই কাটছে তাদের জীবন।
পবিত্র ঈদুল আযহার দিন এমন হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য দেখা গেছে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালাইয়া ইউনিয়নের বগী তুলাতলা খালে। সেখানে শতাধিক মান্তা পরিবার বছরের পর বছর নৌকাতেই বসবাস করছে। নৌকাই তাদের ঘর, সংসার, শৈশব, বিয়ে, জন্ম আর মৃত্যুর ঠিকানা।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ শিকার করেই চলে তাদের জীবন। নদীতে মাছ মিললে চুলায় আগুন জ্বলে, না মিললে অনাহার-অর্ধাহারে কাটে দিন। ঈদের দিনও তাদের কাছে আর দশটা সাধারণ দিনের মতোই। সাধ্য না থাকায় কোরবানিও দিতে পারেন না তারা।
ঈদের দিন (বৃহস্পতিবার) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা। পুরোনো পোশাক পরে নৌকায় খেলছে শিশুরা। কোথাও ছোট চুলায় রান্না হচ্ছে ভাত, কোথাও ডাল। কোনো নৌকায় আবার ফুটছে নদী থেকে ধরা ছোট মাছের ঝোল। তেমনই এক নৌকায় বসবাস করেন হোসনেয়ারা বেগম (৩৯)। নৌকার পেছনের ছোট্ট চুলায় তিনি ভাত রান্না করছিলেন। পাশের পাতিলে ধুয়ে রাখছিলেন ডাল। একটু দূরে বসে ছিল তার দুই সন্তান জয়নব (১২) ও রাসেল (৭)। দুপুরের খাবারের অপেক্ষায় তাদের চোখে ছিল এক ধরনের নীরব বিষাদ।
হোসনেয়ারা বলেন, আমরা স্বামী-স্ত্রী দুইজনই জেলে। কোনো জায়গা-জমি নাই। এই নৌকাতেই জীবন কাটে। কয়েকদিন ধইরা নদীতে মাছ কম পাইতেছি। তাই ঈদে বাজার করতে পারি নাই। পোলাপানরে নতুন কাপড়ও দিতে পারি নাই।
মান্তা জেলে শহিদ সরদার বলেন, আমাগো জন্ম নৌকাত, থাহিও নৌকাত। মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাম জানি না। মাছ পাইলে খাই, না পাইলে না খাইয়া থাকি। আমাগো ঈদের দিন আর অন্য দিনের মধ্যে তফাত নাই। মাছ বেশি পাইলেই ঈদ ঈদ মনে হয়।
নয় বছর বয়সী মান্তা শিশু জান্নাতুলের চোখে ঈদের অন্যরকম স্বপ্ন। সে বলে, ঈদের দিন ঘুরতে মন চায়, পোলাও-মাংস খাইতে মন চায়। কিন্তু আমাগো বাপ-মার টাকা নাই। তাই কোথাও যাইতে পারি না।
আরেক মান্তা নারী চম্পাজান বিবি বলেন, কত মানুষ কুরবানি দেয়, ভালো-মন্দ খায়, পোলাপান আনন্দ করে। আমাগো সেই তৌফিক নাই। কেউ গোস্তও দেয় না, খবরও নেয় না। ডাইল-ভাত খাইয়া দিন যায়।
মানুষের জীবন মান উন্নয়নে কাজ করেন এনজিও কর্মী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বছরের পর বছর নদীতে ভাসমান এই জনগোষ্ঠী সমাজ ও রাষ্ট্রের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ বাসস্থান কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা খুব কমই পৌঁছায় তাদের কাছে। বেশিরভাগ শিশুই বিদ্যালয়ের মুখ দেখে না। ঝড়বৃষ্টি আর নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেই বড় হয়ে ওঠে তারা।
কালাইয়া ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ফিরোজ হাওলাদার বলেন, যাদের জেলে কার্ড আছে তারা ভিজিএফের চাল পায়। ঈদ উপলক্ষে অনেককে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে পরিষদের পক্ষ থেকে সহায়তার সুযোগ সীমিত।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদ বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।