
রাজধানীর রামপুরা ব্রিজের ওপর ঈদের দিন বিকেল থেকে জমে ওঠে ছোট একটি অস্থায়ী বাজার। কোরবানির পশুর মাংস যেখানে অনেকের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে, সেখানে নিম্ন আয়ের একাংশ মানুষের জন্য ভরসা হয়ে উঠেছে ছাট মাংসের এই বাজার।
বৃহস্পতিবার (২৮ মে) বিকেলে সরেজমিনে দেখা যায়, ব্রিজের ওপর প্লাস্টিকের শিট বিছিয়ে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ছাট মাংস বিক্রি করছেন। কোথাও হাড়ের সঙ্গে লেগে থাকা মাংস, কোথাও মাথার অংশ, আবার কিছু চর্বিযুক্ত ও তুলনামূলক ভালো মানের মাংসও রাখা আছে ছোট ছোট ভাগে। ক্রেতারা দরদাম করে সামর্থ্য অনুযায়ী আধা কেজি থেকে এক কেজি বা তারও বেশি মাংস কিনছেন।

ব্যবসায়ীরা প্রতি কেজি ছাট মাংসের দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা হাঁকছেন। তবে ক্রেতাদের অনুরোধ ও দরদামের ভিত্তিতে কিছুটা কম দামে বিক্রিও হচ্ছে। বিক্রেতারা জানান, কোরবানির পর বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা এসব মাংস পরিষ্কার করে বিক্রি করা হচ্ছে।
তাদের ভাষ্য, বেশিরভাগ মাংসই এসেছে কশাইদের কাছ থেকে। বিভিন্ন জায়গায় কোরবানির গরু জবাই ও কাটার সময় জমে থাকা ছাট মাংস একত্র করে এখানে আনা হয়েছে। ছাটের সঙ্গে কিছু ভালো মাংসও মিশিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে।
রিকশাচালক মিনারুল ইসলাম বলেন, “গরুর মাংসের দাম অনেক বেশি। পুরো ভালো মাংস কেনার সামর্থ্য নেই। তাই এখানে এসে দুই কেজি মাংস কিনলাম। বাচ্চারা ঈদের দিনে একটু মাংস খেতে পারবে, এটাই শান্তি।”
তিনি জানান, বিক্রেতারা প্রথমে প্রতি কেজি ৪০০ টাকা দাম চাইলেও দরদাম করে দুই কেজি মাংস ৫৫০ টাকায় কিনেছেন।
আরেক রিকশাচালক মো. আলম বলেন, “পরিবার নিয়ে চার বছর ধরে ঢাকায় থাকি। যে আয় করি, তাতে কোরবানি দেওয়া সম্ভব না। বাজারে মাংসের যে দাম, সেটাও আমাদের নাগালের বাইরে। তাই এখানে মাংস কিনতে এসেছি।”
তিনি আরও বলেন, “গত বছরও এখান থেকে মাংস কিনেছিলাম। ভালো মাংস পেয়েছিলাম বলেই এবারও এসেছি। বেছে কিনতে পারলে এখনও ভালো মাংস পাওয়া যায়। তবে এবার বিক্রেতারা একটু বেশি দাম চাচ্ছেন।”
ছোট মেয়েকে নিয়ে মাংস কিনতে আসা গার্মেন্টসকর্মী আলেয়া বেগম বলেন, “ঈদের দিনে সবাই ভালো মাংস খায়। কিন্তু আমাদের মতো মানুষের পক্ষে ৮০০-৯০০ টাকা দিয়ে এক কেজি মাংস কেনা সম্ভব না। তাই কম দামের মাংস কিনতেই এখানে এসেছি।”
তিনি জানান, দুই কেজি মাংস ৬০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন, যা দিয়ে কয়েকদিন চলবে তাদের সংসার।
আলেয়া বেগমের ভাষায়, “আমাদের পক্ষে কোরবানি দেওয়া সম্ভব না। আবার মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মাংস চাওয়াও সম্ভব না। তাই যতটুকু পারি, ছাট মাংস কিনে নিয়ে যাচ্ছি।”
বিক্রেতা আরিফুল বলেন, “আমি চারটা গরু কাটার কাজ পেয়েছিলাম। সেখান থেকে কিছু ছাট ও ভালো মাংস এনে বিক্রি করছি। যাদের গরু কাটছি, তারাও কিছু মাংস দিয়েছেন। সব একসঙ্গে কেটে বিক্রি করছি।”
তিনি বলেন, “আমাদের কাছ থেকে মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ, দিনমজুর ও রিকশাচালকরাই বেশি মাংস কিনছেন। সবাই একসঙ্গে ভালো মাংস নিতে পারে না। তাই ভালো ও ছাট মাংস মিশিয়ে বিক্রি করছি।”
আরেক বিক্রেতা মো. কালাম বলেন, “আমাদের মাংসের মধ্যে শুধু ছাট নয়, মাথার মাংস, চর্বি এবং কিছু ভালো অংশও আছে। যার যতটুকু সামর্থ্য, সে ততটুকুই নিচ্ছে।”
তিনি জানান, নিজে দুটি গরু কাটার কাজ করেছেন। সেই গরুর মাংসের অংশ ছাড়াও অন্যদের কাছ থেকে কিছু মাংস কিনে এনে সব একসঙ্গে বিক্রি করছেন।
ঈদের আনন্দ যখন অনেকের ঘরে কোরবানির মাংসে ভরপুর, তখন রামপুরা ব্রিজের এই ছোট্ট অস্থায়ী বাজার নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে স্বস্তির এক বিকল্প ব্যবস্থা।