
নীলফামারীতে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় সারসংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। সরকারি মূল্যে সার না পেয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে দ্বিগুণের বেশি দামে খোলাবাজার থেকে সার কিনছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে এমন করুণ চিত্র পাওয়া গেছে।
জেলা সদরের টুপামারী ইউনিয়নের রামগঞ্জ বাজারে বিসিআইসি পরিবেশক মেসার্স ময়েজ উদ্দিনের দোকানে দেখা যায় সার কিনতে ভোর থেকে অপেক্ষারত কৃষকদের দীর্ঘ সারি। ওই ইউনিয়নের সিতারপাঠ গ্রামের কৃষক লুৎফর রহমান ক্ষোভ ঝেড়ে বলেন,
‘হামাক মারি ফেলাছে বাপোরে। দুই দিন থাকি ঘুরায়ছে, লাগে ৩ বস্তা টিএসপি, দিছে হাফ বস্তা—২৫ কেজি।’
একই ইউনিয়নের দোগাছি গ্রামের কৃষক রবিনাথ রায় বলেন,
‘তিন বিঘায় ভুট্টা, দুই বিঘায় আলু করমু। তিন দিন ধইরা ঘুরলাম—টিএসপি, এমওপি, ড্যাব—একডাও পাইলাম না। বাইরত দাম বেশি, তাও মিলতেছে না।’
দুহুলীপাড়ার কৃষক আবদুল ওহাব জানান,
‘ছয় বিঘায় আলু, দুই বিঘায় ভুট্টা। লাগব ৭ বস্তা টিএসপি, ৪ বস্তা এমওপি। এমওপি একডম নাই। টিএসপি ২৫ কেজি দিবার কথা, তাও পাইমু কি না জানি না।’
টুপামারীর কান্দুরার মোড় এলাকায় মেসার্স প্রামাণিক ট্রেডার্সের প্রতিনিধি সাইফ আল হাসান বলেন, তাঁদের ডিলারশিপ নেই। বাইরে থেকে বেশি দামে সার কিনে আবার বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারে সরবরাহ নেই বলে দাম এখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
বর্তমানে তাঁরা প্রতি বস্তা টিএসপি ২,৯০০ টাকা, এমওপি ২,২০০ টাকা ও ইউরিয়া ১,৪০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
জলঢাকা, ডোমার, ডিমলা ও কিশোরগঞ্জ উপজেলাতেও একই চিত্র। জলঢাকার শিমুলবাড়ির কৃষক একাব্বর আলীর আফসোস—
‘তিন দিন ধরে ধরনা দিছি, এক বস্তা সারও পাইলাম না। শুধু আজ-কাল করে সময় দেয়। সার নাই।’
ডোমারের গোমনাতি ইউনিয়নের আমবাড়ি বাজারে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত। বিসিআইসি পরিবেশক রেহানা পারভীনের দোকানে সার না পেয়ে বিক্ষুব্ধ ৫০০–৭০০ মানুষ দোকান ভাঙচুর করেন—এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) নীলফামারী জেলার সাধারণ সম্পাদক তাপস কুমার সাহা।
সারসংকটের কথা স্বীকার করে বিএফএর জেলা সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ সরকার জানান,
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় কৃষকদের চাহিদামতো সার দেওয়া যাচ্ছে না। তবে ইউরিয়া সারের ঘাটতি নেই; টিএসপি ও এমওপির চাহিদা বেশি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী,
নভেম্বর মাসে—
ইউরিয়া চাহিদা: ৮,০৬২ মেট্রিক টন, বরাদ্দ: ৩,৭৬৭ মেট্রিক টন
টিএসপি চাহিদা: ১,৯৭৬ মেট্রিক টন, বরাদ্দ: ১,০৮৩ মেট্রিক টন
এমওপি চাহিদা: ৪,৭৬৫ মেট্রিক টন, বরাদ্দ: ২,৮৭৯ মেট্রিক টন
ড্যাব চাহিদা: ৫,৬৭০ মেট্রিক টন, বরাদ্দ: ৪,০২৩ মেট্রিক টন
ডিসেম্বর মাসেও পরিস্থিতি অপরিবর্তিত—চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন,
সারের কোনো সংকট নেই—বরং কিছু কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। ডিসেম্বরের বরাদ্দ উত্তোলন করা হলে সংকট দূর হবে বলে তিনি দাবি করেন।